কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬ এ ০৩:৫১ PM
কন্টেন্ট: খবর প্রকাশের তারিখ: ২৪-০৫-২০২৬ আর্কাইভ তারিখ: ৩১-০৭-২০২৬
বিশ্ব মৌমাছি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়ায় আজ রবিবার বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটির সার্বিক সহযোগিতায় “জলবায়ু সহনশীল মৌচাষ ও মৌজাত পণ্যের উপকারিতা বিষয়ক সচেতনতামূলক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ” অনুষ্ঠিত হয়েছে। “মানুষ ও মৌমাছি পৃথিবীতে একত্রে বসবাস—একটি অংশীদারিত্ব; যা আমাদের টিকিয়ে রাখে” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত প্রশিক্ষণটির উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মীর শাহে আলম, এমপি। এতে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫০০ জন মৌচাষি অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় বলেন, মৌচাষকে আর ক্ষুদ্র পেশা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, আমদানি বিকল্প, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি কৌশলগত খাত। তিনি বলেন, “মৌমাছি রক্ষা মানে কৃষি রক্ষা, কৃষি রক্ষা মানে খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা, আর খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা মানে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা।”
তিনি আরও জানান, দেশে বছরে অন্তত ৩০ হাজার টন মানসম্মত মধুর চাহিদা পূরণ এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, বগুড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে। বগুড়াকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ Bee Breeding and Honey Processing Plant স্থাপন, উন্নত রাণী মৌমাছি উৎপাদন, ফুডগ্রেড কন্টেইনার, QC Lab, মধু টেস্টিং, প্যাকেজিং, স্টোরেজ ও খুচরা আউটলেট স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে ‘মিল্কভিটা’র আদলে সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে মৌচাষীদের সঙ্ঘবদ্ধ করতে নির্দেশনা দেন। এর জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা প্রদানের আশ্বাস তিনি দেন। এছাড়াও তিনি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে, তাতে Bee Flora বৃক্ষরোপণে জোর দেয়ার কথা বলেন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দেন, যাতে সারাবছর মৌমাছিদের জন্য প্রয়োজনীয় নেক্টার প্রকৃতিতে সুলভ থাকে।
প্রধান অতিথি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান মৌচাষ, নিরাপদ খাদ্য, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী পল্লী শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরডিএতে মৌচাষ গবেষণা কার্যক্রম পরিদর্শন করে এ খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন এবং “সবার আগে বাংলাদেশ” দর্শনের আলোকে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আশা ব্যক্ত করেন যে, বগুড়া হবে নিরাপদ মধুর রাজধানী এবং উত্তরাঞ্চল হবে মৌচাষের শিল্পাঞ্চল। তিনি মসজিদসমূহে আউটলেট স্থাপনের সম্ভাবনার দিকটিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ইমাম-মুয়াজ্জিনরা নিরাপদ খাদ্য ও ভেজালবিরোধী সচেতনতার বার্তা সমাজে পৌঁছে দিতে পারবেন।” এর মাধ্যমে নির্বাচনী ইশতেহারের আরেকটি লক্ষ্যমাত্রা অর্থাৎ ইমাম-মুয়াজ্জিনের দ্বায়িত্বপালনকারীদের অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্য গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একাডেমীর উপ-পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম। আরডিএ, বগুড়া কর্তৃক পরিচালিত “Insight of Beekeeping in Northern Region” গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশে প্রাকৃতিক ও চাষভিত্তিক উৎস মিলিয়ে প্রায় ২০–২৫ হাজার টন মধু সংগ্রহ হলেও চাহিদা ছিল প্রায় ৩০–৩৫ হাজার টন। অর্থাৎ দেশে মধুর ঘাটতি প্রায় ৫–১০ হাজার টন। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০–৯৫ শতাংশ মধুই এসেছে চাষভিত্তিক উৎস থেকে।
ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা, রাণী মৌমাছির ব্রিডিং সেন্টার স্থাপন, সুপার বক্স ব্যবহার, ফুডগ্রেড কন্টেইনার, কীটনাশক ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে দেশে মধু উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। তিনি জানান, সুপার বক্সের সরিষা মধুর ল্যাব বিশ্লেষণে আর্দ্রতা ২০ শতাংশের নিচে, পিএইচ কম এবং টিএসএস বেশি পাওয়া গেছে, যা ভালো মানের মধুর গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জনাব এ কে এম সিরাজুল ইসলাম, নির্বাহী পরিচালক, বাসা ফাউন্ডেশন ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটি এবং ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, গোপালগঞ্জ। তাঁরা বলেন, মৌমাছি পরাগায়নের মাধ্যমে সরিষা, সূর্যমুখী, লিচু, কালোজিরা, ধনিয়া ও ফল-ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষির সঙ্গে মৌচাষ যুক্ত হলে একই জমি থেকে ফসল, মধু ও পরাগায়ন সুবিধা—তিনটি লাভ একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব।
মূল প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর সাবেক পরিচালক ড. একে এম জাকারিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মধুর মৌলিক গুণগত সম্ভাবনা ভালো হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য ট্রেসেবিলিটি, residue test, moisture control, lab certification, adulteration control এবং export-grade packaging নিশ্চিত করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে আরডিএ বগুড়ার মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) জনাব মোঃ ফেরদৌস হোসেন খান বলেন, জলবায়ু সহনশীল মৌচাষ সম্প্রসারণ, মৌমাছিবান্ধব বৃক্ষরোপণ, নিরাপদ মধু উৎপাদন এবং কৃষক-উদ্যোক্তা উন্নয়নে আরডিএ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
বাংলাদেশ মৌচাষী সোসাইটির সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণে প্রায় ৫০০ জন মৌচাষি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন আরডিএ বগুড়ার পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ও কোর্স পরিচালক জনাব মোঃ দেলোয়ার হোসেন, উত্তরবঙ্গ মৌচাষী সমিতির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন জেলার গবেষক, উদ্যোক্তা, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও গণমাধ্যমকর্মীরা। কোর্স সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন একাডেমীর উপ-পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক জনাব অন্তরা খাতুন।